ফরাসি বিপ্লব
অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ সাল ১৭৮৬; বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হন লর্ড কর্নওয়ালিস। ভারত বর্ষের স্বাধিনতার সূর্য অনেক আগেই অস্তমিত হয়েছে আর পশ্চিম আকাশে যেটুকু রক্তিম আভা অবশিষ্ট ছিলো তাও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ওয়ারেন হেস্টিংস এর 'রেগুলেটিং এক্ট' আইন পাশের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণরূপে অবসান ঘটে। বাংলা পরিনত হয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের কেন্দ্র বিন্দুতে। শাসন বললে ভুল হবে 'শোষন' শব্দটাই এখানে অধিকতর মানানসই। হেস্টিংস পরবর্তী কর্নওয়ালিস শাসনামলে জারীকৃত দশসনা আইন পরবর্তীতে 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে' রূপান্তরিত হয়। আর এই 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' আইনের মধ্যে দিয়ে জমির মালিকানা যখন কৃষক হতে জমিদারদের হাতে চলে যায় ঠিক একই সময়ে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার আদায়ের দাবীতে উত্তপ্ত হতে শুরু করে। ভার্সাই নগরীর অধিকার বঞ্চিত দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের খাদ্যের দাবীতে গর্জে ওঠে প্যারিসের রাজপথ, আকাশ, বাস্তিল দূর্গ। বর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্বে শতবছরের নির্জাতিত, নিপীড়িত সাধারন ফরাসি নাগরিকদের নিয়ে গঠিত হয় 'নাগরিক গার্ড' নামক একটি সামরিক বাহিনী আর এই নাগরিক গার্ডের আক্রমণেই পতন ঘটে ফরাসী রাজতন্ত্রের প্রতিক 'বাস্তিল দুর্গ' এবং এরই মধ্যে দিয়ে শুরু হয় 'ফ্রেঞ্চ রেভুলিউশন তথা ফরাসি বিপ্লব' যা মানব ইতিহাসে রচনা করে এক নতুন অধ্যায়। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্মোচিত হয় এক নতুন দিগন্ত। 'গণতন্ত্র' শব্দটি হয়ে ওঠে আরো অধিক অর্থবহ।
বঙ্গ সন্তান জামরঃ লুই দ্য বেনোয়া
![]() |
| লুই বেনোয়া জামর |
ফরাসি লেখিকা ইভ রুজিয়ের বই 'লো রেভ দ্য জামর' থেকে জানা যায় রাজকীয় বিলাসিতায় শৈশব থেকে তারুন্যে পদার্পন করেন জামর এবং ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন রাগী ও মেজাজী। মিশরীয় ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই ফারাও রাজাদের অত্যাচার যখন সীমাহীন পর্যায়ে উপনীত হয় এবং ক্ষমতার দাম্ভিকতায় ফেরাউন যখন নিজেকেই স্বয়ং 'আল্লাহ' বলে দাবী করেন তখন তার ঘরেই প্রতিপালিত হতে থাকেন নবী মূসা(আ:) যিনি পরবর্তীতে তার অনুসারী সহ স্বৈরাচারী একনায়ক শাসক ফেরাউনকে পরাজিত করে মিশরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। একই চিত্র দেখা যায় অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ফরাসি বুরবো রাজতন্ত্রে। ফরাসি রাজপরিবারের সদস্য হয়েও নবী মূসার মতোই রাজাদের দুঃশাসন ও ক্ষমতার অপব্যাবহারের ঘোরতর বিরোধী ও প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন জামর। ধ্রুপদী ফরাসি সাহিত্য ও দর্শনে আগ্রহী হবার সুবাদে তার সাথে পরিচয় ঘটে আরেক মহান দার্শনিক ও ফরাসি বিপ্লবের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা রুশোর 'লা কস্তা সশ্যাল' বইয়ের। চূড়ান্ত রাজনৈতিক স্বেচ্ছসাচারিতা আর নিপীড়িত বিপর্যস্থ ফরাসি সমাজ ব্যবস্থায় তিনিই প্রথম উল্লেখ করেন 'ম্যান ইজ বর্ন ফ্রী বাট এভরিহ্যোয়ার হী ইজ ইন চেইন অর্থাৎ মানুষ জন্মগত ভাবেই স্বধীন, কিন্তু সমাজ তাকে শৃঙ্খলিত করে রাখে'। স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে তীব্র সমালোচনা করে লেখা 'এমিল' বইয়ে তিনি সাম্য, স্বাধিনতার যে ধারনা দেন পরবর্তীতে তা জামর, রোবস্পিয়র সহ শতশত বিপ্লবীর জন্ম দেয় এবং বিপ্লবের এই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ শুধু ফ্রান্স নয় ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। সমগ্র ইউরোপের পট পরিবর্তন করতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে ভলতেয়ার, মন্তেস্কু, রুশো সহ প্রভৃত লেখকের রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি তথা দর্শন।
ধর্ম ও রাজনীতি
সৃষ্টির শুরু থেকেই একটু খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাই ধর্ম ও রাজনীতি একে অপরের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। রাজনীতিবিদেরা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ধর্মকে পুঁজি করে দূর্নীতি করেন দেদারসে আর এসকল দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রনায়কেরাই আবার জনমনে তীব্র ধর্মানুভূতির এক গোপন বীজ রোপন করেন সুপরিকল্পিত ভাবে। সময়ের পালাবদলে চারা গাছ থেকে পূর্নাঙ্গ বৃক্ষ্যে রূপান্তরিত হয় এসকল অন্ধ ধর্মানুভূতি। সুকৌশলী রাষ্ট্রনায়কগন জনগনের এই ধর্মানুভূতির চাদরের আড়ালে লুকিয়ে রাখেন নিজেদের দুর্নীতিপরায়ণ কুৎসিত সত্বা। এর প্রমান আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ বা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক কিংবা বিগত শতক গুলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়।
অগাসবার্গের চুক্তির মধ্য দিয়ে ফ্রান্সেও মুক্তধর্ম চিন্তার পথ রহিত হয়। রাজার ধর্মই প্রজার ধর্ম নীতি চালু হবার ফলে রোমান ক্যাথলিক বুরবো রাজতন্ত্রে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদে বিশ্বাসীরা পড়েন চরম বিপাকে। চারিদিকে জোরপূর্বক ক্যাথলিক খ্রীস্টধর্মে দীক্ষিত হতে বাধ্য করা হয় 'থার্ড স্টেট' তথা তৃতীয় শ্রেণীর সাধারন মানুষদের। এর সুফল লাভ করে দিন দিন আরো স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন রাজা এবং দূর্নীতি ও অত্যাচারী হয়ে ওঠে যাজক শ্রেনী। রাজা ষোড়শ লুই এর পদচ্যুত মন্ত্রী 'নেকার' এর বর্ণনা থেকে জানা যায় তৎকালীন ফ্রান্সের মোট ভূমির ২০ শতাংশের মালিকানা ছিলো গির্জা তথা প্রথম শ্রেণীর যাযকদের হাতে তবে সুবিশাল ভূ-সম্পদের জন্য তাদের কোন কর দিতে হতো না। ১৫৬১ সালে পোইসির চুক্তি অনুসারে যাজকেরা গির্জার ভূ-সম্পত্তির ওপর স্বেচ্ছা কর দিত। রাজা কোনো কর ধার্য করতে পারতেন না। উপরন্তু অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ভোগের পাশাপাশি গরীব কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের এক দশমাংশ ধর্মকর, মৃত্যু কর ও নামকরন কর হিসাবে গীর্জার যাজক সম্প্রদায় গ্রহন করতো। ফলশ্রুতিতে যাজক শ্রেনী দিন দিন ধনী ও কৃষকেরা আরো বেশী হতদরিদ্র হয়ে পড়ে।
| রাজা চতুর্দশ লুই |
অপর দিকে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই ধর্মকে পুঁজি করে ফরাসি রাজতন্ত্রকে একটি স্বৈরতন্ত্রী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। বুরবো রাজারা 'Divine right monarchy' তে বিশ্বাসী ছিলেন। অর্থাৎ তারা মনে করতেন ঈশ্বর রাজাকে ক্ষমতায় নিযুক্ত করেছেন ফলে তারা ঈশ্বর ছাড়া আর কারও কাছে দায়ী নন। ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা নীতির উপর ভিত্তি করে চতুর্দশ লুই ফরাসী রাজতন্ত্রকে সর্বময় ক্ষমতার আধারে পরিণত করেন। রাজার এই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি একসময়ে মন্তব্য করেন- “The state, it is myself” –রাজাই হলেন রাষ্ট্র। রাজা পঞ্চদশ লুই এর মতে, "A king is accountable for his conduct only to to God" একই মতাদর্শে বিশ্বাসী রাজা ষোড়স লুই তার আত্মজীবনীতে লেখেন, "Kings are absolute masters and as such have a natural right to dispose of everything belonging to their subject" বুরবো রাজারা তাদের ক্ষমতাকে সর্বময় করার জন্য ফ্রান্সের পার্লামেন্ট সভা স্টেট জেনারেলের অধিবেশন ১৬১৪ সালে বন্ধ করে দেন। ঐতিহাসিক শেভিল এ ব্যাপারে মন্তব্য করে বলেন, "স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ লোকেরা তাঁদের অসুবিধা ও অভিযোগের কথা রাজার নিকট পৌঁছাতে পারত না। এর ফলে বুরবো রাজতন্ত্র বৃহত্তর জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়"।
রাজাদের এসকল ধর্মভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফলে শুরু হয় বর্বর সামন্তপ্রথা আর প্রকৃত ক্ষমতা ধীরেধীরে পুঞ্জিভূত হতে শুরু করে যাজক ও অভিজাত শ্রেণির হাতে। স্বৈরাচারী ও দুর্নীতি গ্রস্থ এ সকল ইনটেন্ডেন্ট কর্মচারীগন নিজদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হয়ে ওঠে চরম অত্যাচারী। 'লেতর দ্য ক্যাশে' নামক গ্রেফতারি পরোয়ানার সাহায়্যে তারা যেকোন সাধারণ মানুষকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখতে পারতো। ফলে বাস্তিল দুর্গ একসময় নিরপরাধ বন্দিতে পূর্ণ হয়ে যায়। দার্শনিক ভলতেয়ার এই সীমাহীন রাজনৈতিক সংকটের কারণে ফ্রান্সকে ‘রাজনৈতিক কারাগার’ বলেও অভিহিত করেন।
নারীঃ সভ্যতার জননী ও ধ্বংসের কারিগর
বিগত সত্তুর হাজার বছরের মানব ইতিহাসে যতো উত্থান পতন এসেছে তার প্রত্যেকটি তে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। সভ্যতার গোড়াপত্তন থেকে শুরু করে জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র বিনির্মানে পুরুষের পাশাপাশি নারী যেমন সরব অংশ গ্রহন করেছেন একই ভাবে অনেক জাতি, সামাজ, রাষ্ট্র ধ্বংসের পেছনেও দায়ী এই নারী। আদি মানবী ইভের মূর্খতার কারনে যেমন আজ আমরা স্বর্গচ্যুত তেমনি শূর্পনখার হিংসার বিষবাষ্পে রাম-রাবণের যুদ্ধে পুড়ে ছারখার হয়েছিলো গোটা লঙ্কা! ট্রয় নগরী ধ্বংসের পেছনেও দায়ী ছিলেন একজন নারী। মহাকবি হোমারের 'ইলিয়ড এন্ড অডেসি' তে বর্ণিত গ্রীক দেবরাজ জিউস ও নেমেসিসের কন্যা 'হেলেন' এর সৌন্দর্যের আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিলো ট্রয় নগরী। ধ্বংস হয়েছিলো একটি উন্নত সভ্যতা। আবার মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দিগবিজয়ী হবার ইতিহাসও আমাদের অজানা নয়। বাঙ্গালী জাতি হিসাবে আমরা কতটা সৌভাগ্যবান বা দুর্ভাগা তা নির্ণয় করে বলা মুশকিল। আমাদের এই গরীব দেশে আমরা রানী হেলেনের মতো রূপসী শাসক পেয়েছি আবার রাণী ক্লিওপেট্রার মতো দৃঢ় অগ্নিকন্যাও পেয়েছি। অদৃশ্য এক রোলার কোস্টারে চড়িয়ে তারা যেমন আমাদের উন্নতির চরম শিখরে আকাশ ছোয়া স্বপ্ন দেখিয়েছেন তেমনি উন্নতির স্বর্ণদ্বার হতেও বারবার ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন দূর্নীতির অতল খাদের গভীরে।
'পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা' অপবাদটি মাথায় নিয়েও পুরুষ জাতি সর্বদাই কোমলমতি এসকল নারীদের দোষত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে আসছেন। গুগলে একধিক কী-ওয়ার্ড সার্চ দিয়েও নারীর তেমন আশানুরূপ নিকৃষ্ট /বিধ্বংসী কর্মকান্ডের হদিস বের করতে ব্যার্থ হয়েছি। উইমেন ইম্পাওয়ারমেন্টের এই যুগে নারীর সাফল্যগাথার আড়ালে মাটিচাপা পড়ে আছে তাদের সমস্ত অন্ধকার ইতিহাস। ফরাসি আন্দলন পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত করেছে আর এই মহান বিপ্লবের পেছনে নারীর ভূমিকা থাকবেনা এটা অবিশ্বাস্য।
৫ অক্টোবর, সাল ১৭৮৯। বিপ্লবের আগুনে উত্তপ্ত ফ্রান্সের রাজপথ। মুক্তির দাবীতে যখন ফ্রান্সের ঘরে ঘরে বিপ্লবের অগুন জ্বলছে ভার্সাই রাজপ্রাসাদ তখন যেন ঐশ্বর্যের ইন্দ্রপুরী। ক্ষুধার যন্ত্রনায় ক্রন্দনরত শিশুর চিৎকার তখনো ভার্সেই রাণীর হেরেমের প্রাচীর ভেদ করতে পারেনি। প্যারিস থেকে খাদ্যের দাবিতে 'হাঙ্গার মার্চ অব দ্য ওমেন ভার্সাই' তথা মহিলাদের ভুখামিছিল যখন ভার্সেই রাজপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে রুটির দাম কমানোর দাবি জানায় তখন রানী মেরি অ্যান্টয়নেট অবাক হয়ে মিছিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, এরা কী চায়? তার সহচরী উত্তর দেন, এরা রুটির দাম কমাতে বলছে, রুটি চায়। রানী অবাক হয়ে বললেন, রুটি কেন? এরা কেক খেতে পারে না! প্রকৃতপক্ষে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে বিলাস ব্যসনে ব্যস্ত রানী অ্যান্টয়নেট নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি।
ফরাসি রাজতন্ত্রের সব থেকে দূর্বল দিক ছিলো রাজ দরবার থেকে শুরু করে যেকোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহনে রাণীদের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের পর বুরবো বংশে সুযোগ্য শাসকের অভাব দেখা যায়। ঐতিহাসিক শোভেলের মতে রাজা পঞ্চদশ লুই ছিলেন “বিলাসী, রমণীরঞ্জন, প্রজাপতি রাজা” (Butterfly Monarch)। তিনি ছিলেন পরিশ্রমবিমুখ এবং তার উপপত্নী মাদাম দ্যু পম্পাদ্যুরের দ্বারা প্রভাবিত। ষোড়শ লুই সৎ এবং সদিচ্ছাপরায়ণ হলেও তিনিও ছিলেন তার সুন্দরী গর্বিতা পত্নী অস্ট্রিয়ার রাজকুমারী মেরী অ্যানটোনেটের বশীভূত। রাণীরা ছিলেন অদূরদর্শী, বিলাসী ও খামখেয়ালি। ফলে তাদের মতের সাথে অমিল হওয়ায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ হতে বহিষ্কৃত হন অনেক যোগ্য ব্যাক্তি। ১৭৮৯ সালে ফ্রান্স যখন দুর্ভিক্ষের চরমে তখন দৈন্যদশাগ্রস্থ ফরাসি অর্থনীতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভুত হন অর্থনীতিবিদ 'নেকার'। ক্ষমতাসীন হয়ে তিনি নতুন কর-নীতি প্রণয়ন করেন ফলে একদিকে যেমন তিনি হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষের চোখের মণি অপরদিকে তিনি অভিজাত শ্রেনীর ষড়যন্ত্রের শিকার হন অনতিবিলম্বে। রাণীর প্ররোচনায় রাজা ষোড়শ লুই তাকে মন্ত্রী থেকে পদচ্যুত করে ফ্রান্সের দুর্দিন আরো ঘনীভূত করেন। একই ভাবে রাণীর প্ররোচনায় বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ 'তুর্গো'কেও মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারণ করেন। ফলে অপরিনামদর্শী মূর্খ রাণীর স্বেচ্ছাচারিতা ও অভিজাত শ্রেনীর স্বার্থন্বেষীতায় ফরাসি অর্থনীতি নতুন করে যে সংকটে পড়ে তা ফরাসি বিপ্লবকে করে তোলে আরো বেগবান। বুরবো রাজাদের এই ব্যক্তিগত অযোগ্যতার কারনে রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষমতা ধীরেধীরে অভিজাত শ্রেণীর হস্তগত হয়ে পড়ে, রাজা হন ক্ষমতা শুন্য জড়পুত্তলী।
ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হবার পেছনে যেমন রাণীদের স্বেচ্ছাচারীতা দায়ী তেমনিভাবে ফরাসি বিপ্লব সফল করে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ফরাসি নারীদের ভূমিকাও অপরিসীম। তবে ফরাসি বিপ্লবে যে নারীর অবদান সবথেকে বেশী তিনি মেরী ওলস্টোনক্রাফট। অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দুর সমন্বয়ে গড়া এই নারী শুধুমাত্র ফরাসি বিপ্লব নয়, পুরুষতান্ত্রের ইতিহাসেও প্রথম বিপ্লবী নারী। কার্ল-মার্ক্স যেমন সমাজতন্ত্রে জন্মদাতা তেমনি মেরী হয়েছেন 'নারীবাদ' এর প্রসূতি। ১৭৯১ সালে তিনি লেখেন 'ভিন্ডিকেশন অফ দ্য রাইটস অফ ওম্যান' আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর পূর্বে তার এই বইটিই ছিলো কট্টর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীমুক্তির দাবীতে লেখা প্রথম বই। মেরী তার ভিন্ডিকেশন উৎসর্গ করেছিলেন ফরাসি বিপ্লবী নেতা ট্যালিরাদের নামে। ভেবেছিলেন নারীশিক্ষা আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখবেন ট্যালিরাদ তবে মেরীর বিপ্লবী চেতনায় উদ্ভুদ্ধ বিপ্লবীরাও বিপ্লব পরবর্তীতে নারীর অধিনতায় বিশ্বাসী নাহয়ে বেছে নেয় পুরুষতন্ত্র। মেরীর আশা পর্যবসিত হয় হতাশায়। মেরী সফল বিপ্লবী হলেও তার সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি তবে তার কালজয়ী ভিন্ডিকেশনকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে গড়ে ওঠে নারীবাদের বিভিন্ন ধারা।
ম্যাক্সিমিলান রোবস্পিয়র
নিরীহ জনগনের উপর ক্ষমতাসীন শাসকের অত্যাচার যখন সীমা অতিক্রম করে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া নিরস্ত্র সাধারণ মানুষও তখন হয়ে ওঠে চিতা বাঘ অপেক্ষা ক্ষিপ্র, পারমানবিক বোমা থেকেও হয়ে ওঠে অধিক শক্তিশালী বিষ্ফোরক। বিপ্লব ছাড়া স্বাধিনতা অর্জন অসম্ভব তবে বিপ্লব পরিচালনা আর রাষ্ট্র পরিচালনা জিনিশ দুটি এক নয়। খুব কম বিপ্লবী নেতাই আছেন যারা ক্ষমতাসীন হবার পর যোগ্য রাষ্ট্র নায়ক হতে পেরেছেন। ক্ষমতার লোভ সংবরণ করার ক্ষমতা সবার থাকে না আর যাদের থাকে তাদের মানুষ বললে ভুল হবে তারা মহামানবের পর্যায়ে পড়েন। জাতি হিসাবে আমরা দূর্ভাগা কারন আমরা এখন পর্যন্ত কোন মহামানব তুল্য রাষ্ট্রপ্রধান পাই নি। আমাদের পূর্ববর্তী নেতা যারা ছিলেন তাদের বেশীরভাগই ছিলেন ক্ষমতালোভী। সারাজীবন যে লোকের সততায় মুগ্ধ হয়ে যার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যখনই যার মাথায় রাষ্ট্রের মুকুট পড়িয়েছি কোন এক অদ্ভুত কারনে ক্ষমতা লাভের পর সেই নেতাই তার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষে শয়তানের পায়ে নিজের মাথার তাজ সঁপে দিয়েছেন। মূর্তমান আদর্শ বিপ্লবী থেকে হয়ে উঠেছেন বিলাসিতায় মগ্ন অত্যাচারী এক শয়তান!
পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমারের সরকার প্রধান অং সান সু চি যিনি গনতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে সংগ্রাম করার জন্য দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দী ছিলেন, যিনি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পান। সেই মমতাময়ী নারী যখন ক্ষমতা লাভ করেন তার সামরিক বাহিনী শুধু মাত্র ধর্মকে কেন্দ্র করে ২৫০০+ রোহিংগা অধিবাসী হত্যা করে!! তবে কি আমরা ধরে নিবো যে, গণতন্ত্রের মুখোশ পড়া এই সু চি প্রকৃতপক্ষে পুজিবাদের একজন গুপ্ত হন্তারক?
![]() |
| ম্যাক্সিমিলান রোবস্পিয়র |
সু চি'র মতোই এমন এক বিপ্লবীর জন্ম হয়েছিলো ১৭৫৮ সালের ৬মে ফ্রান্সের আরাসে। ছোটবেলা থেকেই দুর্দান্ত মেধাবী ছিলেন তিনি। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম নিলেও অসামান্য মেধার জোরে প্যারিস ইউনিভার্সিটি থেকে স্কলারশিপ পেয়ে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৭৮৯ সালে আরাসের স্টেট জেনারেল নির্বাচিত হওয়া এই ব্যাক্তি তার সততা, আদর্শ ও নিষ্ঠার কারনে সাধারণ জনগনের নিকট 'দ্যা ইনকরাপটেবল' নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ফ্রান্সের অলিতে গলিতে ফরাসিবাসীর ত্রাণকর্তা হিসাবে উচ্চারিত হতে থাকে তার নাম। স্বল্প সময়ের ভেতর বিপ্লবী 'জ্যাকবিন ক্লাবের' অন্যতম প্রধান ব্যাক্তিতে পরিনত হন তিনি। মার্ক্সবাদী বিশ্বাসী এই বিপ্লবী যুবকের নাম, ম্যাক্সিমিলান রোবস্পিয়র।
১৪ই জুলাই ১৭৮৯। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের খাদ্যের দাবীতে উত্তপ্ত প্যারিসের রাজপথ। বিক্ষোভ ঠেকাতে জনতার বিপক্ষে রাজা সেনা মোতায়েন করলেও উত্তেজিত জনতার তোপের মুখে সসৈন্য সরে দাড়ান সেনা অধিনায়ক। রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সাধারণ মানুষের হাতে। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। কোণঠাসা হয়ে পড়ে ফরাসি রাজ পরিবার।।
চলবে......


