Friday, February 21, 2025

পাপেট || রিফাত নাসরুল্লাহ

শীতের শেষ। বরফ গলতে শুরু করেছে। গ্রামের এলোপাথাড়ি রাস্তায় নিজের মনেই খেলাচ্ছলে আশ্রমে ফিরেছিল ৮ বছরের অনাথ শিশু লাল বাহাদুর। অদূরেই রাস্তার বাঁকে কাদা পানিতে কুড়িয়ে পায় একটি  হলুদ রঙের সিংহের পাপেট। সযত্নে তুলে নিয়ে পরিষ্কার করে পাপেটটিকে। আশ্রমে বড় হওয়া লাল বাহাদুরের কাছে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া পাপেট্টিকেই মনে হয় ঈশ্বর প্রদত্ত কোন উপহার। তার শুষ্ক মুখে পাপেট সিংহ মুহূর্তেই হাসি এনে দেয়। ঠিক যে মুহূর্তে লাল বাহাদুর পাপেটটিকে নিয়ে খুশি মনে আশ্রমে ফিরছিলো সে ঠিক একই সময়ে কেউ একজন বিষাদের পূজা করছিলো যার তীব্র যন্ত্রণার সাক্ষী এই পাপেট।

শাফিন নগর হেরিটেজ আর্ট কলেজের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে অনার্স শেষ করে মাস্টার্স করছে এখানে। পড়াশোনার পাশাপাশি ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করে। তার আরো একটা পরিচয় আছে, সে একজন ভেন্ট্রিলোকুইস্ট। সহজ ভাবে বলতে গেলে পাপেট হাতে পাপেটের কণ্ঠে কথা বলে লোক হাসানোর একটা খেলা।  এই কাজটা অবশ্য সে শখের বসেই করে। দূরপরবাসে তার ডামি পাপেটটাই তার একমাত্র বন্ধু যার সাথে সে তার ভালোলাগা, খারাপ লাগা প্রতিটা মুহূর্তই শেয়ার করে। সে তার ডামি পাপেট এর একটা নাম দিয়েছে, 'মুফাসা'। 

গেলো সপ্তাহে মল রোডে মুফাসা কে নিয়ে স্ট্রিট শো করছিলো শাফিন। তাকে ঘিরে জড়ো হওয়া পথশিশু ও ট্যুরিস্ট আগ্রহ নিয়ে দেখছিলো তার পারফর্মিং আর্ট। সেখানেই তার সাথে পরিচয় হয় প্রিয়ন্তির। প্রিয়ন্তি মানালিতে বেড়াতে এসেছে। অতি রূপবতী এই তরুণী শাফিনের ভেন্ট্রিলোকুইজমে মুগ্ধ হয়ে পরিচিত হতে এসে জানতে পারে শাফিন নিজেও বাংলাদেশি এবং দ্রুতই তাদের ভেতর গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। বিয়াজ রিভার, ন্যাচার পার্ক থেকে শুরু করে সোলাং ভ্যালি সবকিছু ঘুরিয়ে দেখায় শাফিন। মানালীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় প্রিয়ন্তি আর আটলান্টিকের নীল জলরাশির মতো প্রিয়ন্তির নীল চোখে ঠাঁই হারায় শাফিন। শাফিন তার ভালোবাসার কথা জানাতে চায় প্রিয়ন্তিকে। আমন্ত্রণ জানায় ডিনারের, সঙ্গে নিয়ে আসে একটা প্রোপোজাল রিং। অতি যত্নে যখন প্রিয়ন্তির আঙ্গুলে রিং পড়ানোর জন্য তার হাতের গ্লবস টা টেনে খুলে ফেলে তার চোখ আটকে যায় প্রিয়ন্তির অনামিকায় থাকা ওয়েডিং রিং এ। শাফিন আর কিছুই বলতে পারে না। প্রিয়ন্তিকে নিয়ে দেখা তার স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। নিঃশব্দে দ্রুত উঠে যায় শাফিন, আড়াল করে নেয় নিজেকে। শাফিনের অপ্রত্যাশিত আচরণে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও অদৃশ্য একটা টান অনুভব করে প্রিয়ন্তি। এই অনুভূতির নাম জানা নেই তার তবে ফেরার আগে শেষবারের জন্যে হলেও একবার  দেখা করতে চায় শাফিনের সাথে।


ন্যাচার পার্কের এক কোনায় পাইন গাছের ছায়ায় জড়সড় হয়ে বেঞ্চে বসে আছে শাফিন। দুপুর গড়িয়ে এখন বিকাল, পশ্চিমাকাশে হেলে পড়া সূর্যের সোনালি আভায় চারপাশ চিকচিক করছে। উত্তরের হিমশীতল বাতাসেও শাফিন দিব্যি বসে আছে যেন মানালীর ঠান্ডা তাকে স্পর্শ করছে না। তার নিশ্চুপ শীতল চোখ শুধু মাত্র এক জোড়া হাতের অপেক্ষায় যে হাতের স্পর্শে মুহূর্তেই বিগলিত হয়ে যাবে হিমালয়ের সমস্ত হিমশৈল, যে হাতের একটু স্পর্শ পেলেই থেমে যেতো তার বুকের ভেতর চলতে থাকা সাইবেরিয়ান ঝড়। বিক্ষিপ্ত চিন্তা ভাবনায় শাফিন যখন ঘোরের ভেতর ধীর পায়ে প্রিয়ন্তি এসে তার পাশে বসে। তার চোখ নির্লিপ্ত। দুজনের মস্তিষ্কে হাজারো কথা জমে আছে অথচ সামনে এসে বলা হলো না কিছুই। দীর্ঘক্ষনের নিরবতা ভেঙে শাফিন তার ডামি পাপেট মুফাসা কে তুলে দেয় প্রিয়ন্তির হাতে। প্রিয়ন্তি কিছুই বলে না, নিশ্চুপেই উঠে আসে। শেষবেলায় শাফিন কে সে তার ভেজা চোখ দেখাতে চায় না। 


বিয়াজ রিভারের কোল ঘেঁষে পাথুরে রাস্তা ধরে প্রিয়ন্তির গাড়ি ছুটে চলছে। রাস্তার ঝাঁকিতে ব্যাগ থেকে কখন যে মুফাসা গাড়ির জানালা দিয়ে পড়ে যায় প্রিয়ন্তি জানতেও পারে না। শাফিনের দেয়া শেষ স্মৃতিটাও রাস্তার কাদা জলে মিশে যায়। হয়ত এটাই ছিল নিয়তি। হয়ত প্রকৃতি চায়নি কোন পিছুটান থেকে যাক। হয়ত এ কারণেই শাফিনের দেয়া শেষ ভালোবাসার সাক্ষর প্রিয়ন্তির হাত বদল হয়ে লাল বাহাদুর নামের এক ছোট্ট বালকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। লাল কোনদিনই জানবে না শাফিন প্রিয়ন্তির এই অব্যক্ত ভালোবাসার গল্প। হয়ত শাফিন প্রিয়ন্তি নিজেরাও একদিন ভুলে যাবে তাদের এই অসঙ্গায়িত অনুভূতির কারণ। কালের অতলে তলিয়ে যাবে না পাওয়ার আক্ষেপ। ফরাসি দার্শনিক ও গণিতবিদ এমিলি দ্যু শাতলে প্রথমবার বলেছিলেন, শক্তির যেমন ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই কেবল এক রূপ থেকে অন্যরূপে পরিবর্তিত হয়। ঠিক তেমনি আমাদের জীবন চলার পথ। আমাদের পছন্দ, প্রিয় বস্তু কিংবা ভালোবাসার মানুষ কোন কিছুই চিরন্তন নয়। সময়ের প্রয়োজনে ভালোবাসা হারিয়ে যাবে একইভাবে সময়ের টানেই ফিরে আসবে। হয়তো ভিন্নরূপে, ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন হাতে, নতুন মোড়কে।।


গল্পকারঃ রিফাত নাসরুল্লাহ

মুলভাবনাঃ শিরোনামহীন

No comments:

Post a Comment

পাপেট || রিফাত নাসরুল্লাহ

শী তের শেষ। বরফ গলতে শুরু করেছে। গ্রামের এলোপাথাড়ি রাস্তায় নিজের মনেই খেলাচ্ছলে আশ্রমে ফিরেছিল ৮ বছরের অনাথ শিশু লাল বাহাদুর। অদূরেই রাস্তার...