সালটা ২০১৫/১৬, সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা রেখেছি। হাতে তখন অঢেল সময়। আড্ডা ঘোরাঘুরি করেই দিন কাটছিলো। আর সুযোগ পেলেই চলে যাইতাম ঢাকায় ছোট মামার কাছে। সে শুধু আমার মামা না, আমার বন্ধু, মেন্টর, অতি পছন্দের একজন মানুষ। আমার ব্যাক্তিগত জীবনে যার প্রভাব সীমাহীন। হুমায়ুন আহমেদের হিমুর মতো আমরাও ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে সারাদিন-রাত হেটে বেড়াতাম আর কলা খাইতাম। সে সময় পাকা কলা এবং রং চা ছিলো আমাদের জাতীয় খাবার।
যাইহোক, মামার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পরিচিত হই শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য, ফাইন আর্টস সর্বোপরি আমার চেনা জগতের বাইরে পৃথক এক দুনিয়ার সাথে এবং এই ভদ্রলোকের প্ররোচনায় তখন টুকটাক বই পড়া শুরু করি। সে আমাকে বই সরবরাহ করতো আমি সেগুলো পড়ে তাকে বুক রিভিউ লিখে পাঠাতাম। আহমেদ ছফা, হুমায়ুন আজাদ কিংবা দস্তয়েভস্কির মতো কাল জয়ী লেখকের লেখার সাথেও পরিচয় মামার মাধ্যমে।
তো মামা একদিন একটা বই সাজেস্ট করলো, যে জ্বলে আগুন জ্বলে || হেলাল হাফিজ আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই লোক আবার কে? মামা শুধু বললো, তুই পড়... আমি বইটা সংগ্রহ করে পড়লাম, প্রচণ্ড মুগ্ধ হলাম। ইতঃপূর্বে যে সব কবির লেখা পড়েছি সে সবের মূল বক্তব্য ছিলো প্রেম, বিরহ কিংবা বিদ্রোহ। হেলাল হাফিজ এই এক জায়গাতে ছিলেন বাকি সবার থেকে আলাদা। তার প্রেমে ছিলো যুদ্ধের দামামা, তার বিদ্রোহে ছিলো ভালবাসার আকুলতা। প্রচলিত বস্তা পচা কবিতার ছক থেকে বের হয়ে তিনি যা সৃষ্টি করলেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমি শুধু পড়ে গেলাম। নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়, ইচ্ছে ছিলো, অশ্লীল সভ্যতা কিংবা ফেরিওয়ালা পড়তে পড়তে একটা পর্যায়ে মনে হলো আমার নিজেরও কিছু লেখা উচিৎ। হেলাল হাফিজের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে শুরু করলাম তুমুল লেখালেখি। বস্তা পচা সেসব কবিতার একমাত্র পাঠক এবং সমালোচক ছিলেন মামা। মামাকে প্রায়ই বলতাম হাফিজের মতো একদিন আমিও একটা বই লিখবো যে বই হবে 'যে জলে আগুন জ্বলে'র আদলে। এবং সেই বই এর ভূমিকা লিখবেন আপনি আর প্রচ্ছদ উন্মোচন করবে আমার সাহিত্য গুরু কবি হেলাল হাফিজ।
তারপর কেটে গেলো কয়েকটা বসন্ত। আমার জীবনেও ঘটলো হাওয়া বদল। জীবনের বাস্তবতায় ব্যাস্ত হয়ে লেখালেখিতে ভাটা পড়লো। বই লেখার কাজও থেকে গেলো অসমাপ্ত। মামা এখন বিলাতে ব্যাস্ত, শিল্প সাহিত্য নিয়ে আলাপ হয় যৎসামান্য। যেই হেলেনের বিচ্ছেদ হাফিজকে বানিয়ে ছিলো কবি তেমনই এক হেলেনের সাথে আমার প্রণয়ের পূর্ণতা যখন দ্বারপ্রান্তে তখনই আচমকা শুনলাম কবি আর নেই! কি অসীম শুন্যতা, কি অবাস্তব নিস্তব্ধতা, কি অসম্ভব নিঃসঙ্গতা!! হেমন্তের উজ্জ্বল শীতল চাঁদ যখন মধ্য গগনে জ্যোৎস্না ছড়াতে ব্যস্ত, খুব নিভৃতে হাফিজ অসীমের পথে যাত্রা করলেন অথচ আমরা জানতেও পারলাম না বাংলা সাহিত্যের হেলাল চিরতরে ডুবে গেলো অবহেলা, আক্ষেপ আর বিচ্ছেদের যন্ত্রণা সঙ্গে নিয়ে চিরতরে।
সব শেষে এটাই বলতে চাই; গুরু, এ জীবনে আপনার সাথে আর দেখা হলো না তবে গুরুদক্ষিণা হিসাবে আমার অসমাপ্ত বইটা এবার শেষ করবো আপনাকে উৎসর্গ করে। প্রেম ও দ্রোহের উর্ধে অচেনা কোন এক ভুবনে হয়তো আমাদের দেখা হবে, সেদিন আপনাকে আমার কবিতা আবৃত্তি করে শুনাবো। ততোদিন পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট বুকে চেপে শুধুই অপেক্ষা। আপনিই তো বলতেন, 'বেহিসেবি মনের খরচে খরচ হয়ে যাবো একদিন, তোমার নামে বাকি থাকবে ছোট্ট একটা ঋণ' অথচ আপনার এ ঋন শোধ করার ক্ষমতা স্রষ্টা আমাদের দেন নাই। অন্য ভুবনে ভালো থাকবেন প্রিয় কবি।

No comments:
Post a Comment