Thursday, June 11, 2020

কাফকা ও পুতুল সমাচার | রিফাত নাসরুল্লাহ




বিংশ শতকের সর্বাধিক আলোচিত ও প্রভাবশালী সাহিত্যিকের প্রশ্ন উঠলে সর্বাগ্রে যার নাম বিবেচিত হয় তিনি কালজয়ী জার্মানভাষী ঔপন্যাসিক, ফ্রান্‌ৎস কাফকা।
উনিশ শতকের শেষ ভাগ, সমগ্র ইউরোপে সবে মাত্র শিল্পায়নের ছোঁয়া লাগতে আরম্ভ করেছিলো। আর শিল্প-সাংস্কৃতির চর্চাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছিলো বর্তমান চেক-প্রজাতন্ত্রের রাজধানী 'প্রাগ'। ইউরোপীয় সাংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র এই 'প্রাগ' শহরেই জন্মগ্রহণ করেন 'কাফকা'। জাতিতে ইহুদি ছিলেন আর আর্থ-সামাজিক মর্যাদায় বলা চলে 'মধ্যবিত্ত'। অইন বিষয়ে পড়াশুনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ অতঃপর শুরু করেন লেখালেখি।  তবে চল্লিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে ভদ্রলোক কখনও বিবাহ করেন নাই (সম্ভবত এ কারনেই তিনি সফলতার সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করতে পেরেছিলেন)।
যদিও ফেলিস বাউয়ার, মিলেনা সহ আরো অনেক নারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন তিনি যার প্রমাণ পাওয়া যায় তার নিজেরই লেখা, 'Letters to Milena' এবং 'Letters to Felice' সহ অন্যান্য বইয়ে।



যাইহোক, একদিন বার্লিনের একটি পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এবং অপ্রত্যাশিত ভাবে তার সাথে পরিচয় ঘটে এক পথশিশুর যে তার প্রিয় পুতুলটি হারিয়ে ফেলে দিশেহারা। কাফকা এবং মেয়েটি বেশ কিছু সময় পুতুলটির খোঁজাখুজি করে ব্যার্থ হন এবং পরের দিন মেয়েটিকে তার সাথে দেখা করতে বলেন।
পরের দিনও তারা পুতুলটি খুঁজতে আরম্ভ করে এবং আগের দিনের মতই নিরাশ হয়। তবে আজ একটা অদ্ভুত কান্ড ঘটিয়ে বসেন কাফকা। নিজের পকেট থেকে একটি চিঠি বের করে দাবী করেন চিঠিটা তার (মেয়েটির) পুতুল তাকে লিখে পাঠিয়েছে। বাচ্চা মেয়েটি সরল মনে এটাই বিশ্বাস করে ফেলে। কাফকা পুতুলের লেখা চিঠিটি পড়ে শোনায় মেয়েটিকে। পুতুল তার চিরকুটে জানায়, "মন খারাপ করে কান্নাকাটি করোনা, আমি পৃথিবী ভ্রমনে বের হয়েছি। আমি নিয়মিত আমার ভ্রমণ কাহিনীর অভিজ্ঞতা তোমাকে চিঠি লিখে জানাবো "
আর এরই মধ্যদিয়ে কাফকার জীবনে একটি নতুন গল্পের অধ্যায় শুরু হয় যা তার জীবনের শেষদিন অবধি অব্যাহত ছিল।

পরবর্তীতে মেয়েটির সাথে কাফকা যখন দেখা করতেন প্রতিবার পকেট থেকে পুতুলের লেখা একটি চিঠি বের করে পড়ে শোনাতেন। প্রিয় পুতুলের লেখা রোমাঞ্চকর ভ্রমন অভিজ্ঞতার গল্প শুনে মেয়েটিও উচ্ছ্বসিত হতো। অবশেষে, কাফকা একটি নতুন পুতুল কিনে বার্লিনে ফিরে আসেন এবং মেয়েটির সাথে দেখা করেন। স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন পুতুল পেয়ে মেয়েটি চিৎকার করে বলে ওঠে, "এটা আমার পুতুলের মতো দেখতে নয়, এটা আমার পুতুল না! "
কাফকা তখন আবারও একটি চিঠি বের করে মেয়েটিকে পড়ে শোনান যেখানে পুতুলটি লিখেছিল, "আমার ভ্রমণ আমাকে বদলে দিয়েছে।" ছোট মেয়েটি পূর্বের মতো এ কথাও বিশ্বাস করে এবং নতুন পুতুলকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুশি মনে বাড়ি ফিরে যায়।
কাফকার ছিলো প্রচন্ডরকম খাবারের প্রতি অনিহা। একেতো পুষ্টিহীনতা তার উপর প্রাণঘাতী যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে পূর্বে বর্ণিত ঘটনার এক বছর পরেই মৃত্যু বরন করেন তিনি।
কাফকার মৃত্যুর বহু বছর পর সেই ছোট্ট মেয়েটি শরীর ও মননে প্রাপ্তবয়স্ক সুন্দরী কুমারী হয়ে ওঠে। প্রিয় পুতুলটি এখনো তার সাথেই থাকে। প্রিয় পুতুলের সাথে সময় কাটানোর মধ্যদিয়ে হঠাৎ একদিন পুতুলের ভেতর একটি চিঠি আবিষ্কার করে মেয়েটি। কাফকার স্বাক্ষরিত ক্ষুদ্র পত্রে মেয়েটিকে সম্বোধন করে তিনি লেখেন, "তুমি যা-কিছু ভালোবাসো তার সবটাই হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে তবে বিশ্বাস রেখো, দিন শেষে ভালোবাসা ফিরে আসবে, হয়তো অন্য রূপে।"



কাফকার শেষ চিঠি পড়ার পর মেয়েটার অনুভূতি কি ছিলো আমি জানি না। চিঠিটা পড়ার পর মেয়েটা আড়ালে কেঁদেছিল কিনা তাও আমি জানি না। তবে কাফকার সহজ সাবলিল জীবনবোধ আমাকে মুগ্ধ করেছে। একটি বাচ্চা মেয়ের মনের সরল বিশ্বাসকে অক্ষুণ্ণ রেখে একটা হারিয়ে যাওয়া পুতুল ও কিছু মিথ্যে চিঠির নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে যে শিক্ষা তিনি দিতে চেয়েছিলেন সেটি আমাকে অভিভূত করেছে। আমরা নিজেদের বেঁচে থাকার জন্য একটা অবলম্বন খুঁজি। প্রিয় জিনিস আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই অথচ আমরা প্রায়শই ভূলে যাই, এই নশ্বর পৃথিবীতে কোন কিছুই কন্সট্যান্ট নয়। শক্তির যেমন ক্ষয় নেই, ধ্বংস নেই কেবল এক রূপ থেকে অন্যরূপে পরিবর্তিত হয় ঠিক তেমনি আমাদের জীবন চলার পথ। আমাদের পছন্দ, প্রিয়বস্তু কিংবা ভালোবাসার মানুষ কোন কিছুই চিরন্তন নয়। সময়ের প্রয়োজনে তারা হারিয়ে যাবে একইভাবে সময়ের টানেই তারা ফিরে আসবে। হয়তো ভিন্ন রূপে, নতুন মোড়কে।।

©রিফাত নাসরুল্লাহ
খুলনা, ২০২০

No comments:

Post a Comment

পাপেট || রিফাত নাসরুল্লাহ

শী তের শেষ। বরফ গলতে শুরু করেছে। গ্রামের এলোপাথাড়ি রাস্তায় নিজের মনেই খেলাচ্ছলে আশ্রমে ফিরেছিল ৮ বছরের অনাথ শিশু লাল বাহাদুর। অদূরেই রাস্তার...